‘চক্ষু-চড়কগাছ’!

‘চক্ষু-চড়কগাছ’! ~ শাশ্বত লাহিড়ী

বাংলার একটি অতিপ্রাচীন প্রবাদ।
কোনো ঘটনায় বিস্মিত মানুষের চোখ-কপালে ওঠানো ভঙ্গী বোঝাতে বাংলায় যা যুগযুগান্ত ধরে চলে আসছে। আজ চৈত্র-সংক্রান্তি, চড়কপূজা। লোকমুখে ‘শিবের-গাজন’ বলে পরিচিত। এই পূজার সাথে তথাকথিত ব্রাহ্মণ্যবাদের চেয়েও বাংলার লোকাচার জড়িত থাকায় এতে সরাসরিভাবে সব স্তরের মানুষের অংশগ্রহণ অনেক বেশি চোখে পড়ে। পুরাণ অনুসারে, শিবের উপাসক ‘বাণ রাজা’ আজকের দিন শ্রীকৃষ্ণের সাথে যুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত হয়ে শেষে অমরত্ব লাভের আশায় নিজের রক্তাক্ত শরীর নিয়ে নৃত্যগীতের মাধ্যমে শিব’কে তুষ্ট করে নিজের অভীষ্ট সিদ্ধ করেন, সেই স্মৃতি’তে শৈব সম্প্রদায় চৈত্রের শেষ দিনে এই বিশেষ প্রথা পালন করে। এই পূজার সাথে বিভিন্ন অদ্ভুত, বিচিত্র কিছু খেলা জড়িত যা প্রকারান্তরে পূজার মূল আচার হিসাবে পরিচিত। পূজার আগের দিন, চড়কগাছের লম্বা তক্তাটিকে সিঁদুরলিপ্ত করে রাখা হয়, যাকে ‘শিবের পাটা’ বা ‘বুড়োশিব’ বলা হয়। এই গাছটিকে কেন্দ্র করেই বিভিন্ন খেলা, বা শারীরিক কসরৎ অনুশীলন করাই এই পূজার মূল উপাচার যেমন, জ্বলন্ত অঙ্গারে হাঁটা, বাণফোঁড়া, শিবের বিয়ে, বঁটিঝাঁপ, ঝুলঝাঁপ, কাঁটাঝাঁপ, অগ্নিনৃত্য, চড়কগাছে দোলা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
রাতে, শিবের উদ্দেশ্যে খিচুড়ি ও শোলমাছ দিয়ে ‘হাজরা-পূজা’ করা হয়। ১৮৬৩ সালে ব্রিটিশ সরকার এই পূজার ভয়ানক অনুশীলন রীতির কারণে আইন করে এই পূজা নিষিদ্ধ করলেও, আজ অবধি দুই বাংলার বহু প্রাচীন শিবের থানে এই পূজা মহা সাড়ম্বরে পালিত হয় আজকের দিনে…

বেহালা_চড়কতলা এমনই একটি শতাব্দীপ্রাচীন দেবালয় তথা জনপদ।
আমরা ঘুরতে ঘুরতে যখন চড়কতলায় পৌঁছাই, সেখানে গিয়েই লক্ষ্য করি এই স্থানের প্রাচীনত্ব, তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব। বিশাল বটগাছের নিচে বাংলার লোকদেবতা পঞ্চানন মন্দির সংলগ্ন যে পুকুর, তা আজ কচুরিপানায় ভরা এক ডোবায় পরিণত। তার পাশে দাঁড়িয়েই এক প্রৌঢ়া আমাদের বলেন, এটি পারিবারিক পুকুর হলেও একসময় এই পুকুরের প্রচুর ঘাট ছিল, এখানেই একসময় বাঁধা হত বিশাল চড়কগাছ। এছাড়াও, ছোটবেলার স্মৃতি থেকে উঠে আসে কালীঘাটে’র স্বনামধন্য নকুলেশ্বর-তলা’য় ঝাঁপ, ধুনো পোড়ানো, মেলা ইতিহাস-প্রসিদ্ধ। সারা কলকাতা’র একসময় এমনই সব বিখ্যাত গাজনের চল ছিল, যা দেখে সত্যি’ই এককালে লোকে’র চক্ষু চড়কগাছ হতো।

বেহালা চড়কতলার সন্ধান আমরা পেয়েছিলাম আমাদের ওয়াটারবডি সার্ভে করতে গিয়ে বেহালার ১২১ নম্বর ওয়ার্ডে।এই পুকুরে একসময় চড়কের সময় বিশাল বড় বড় গাছ বাঁধা হতো। বাংলার বিভিন্ন জেলার প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে ভবঘুরে সন্ন্যাসীরা সপ্তাহখানেক আগে থেকে এসে বাসা করতো এই চড়কতলায়। এই পুকুরে বাঁধা বিশাল গাছে চড়কের প্রসিদ্ধ ঝাঁপ, বিভিন্ন ভয়ানক খেলা প্রদর্শনী চলতো। এই পুকুরের স্বচ্ছ জলেই পুজোর রান্না থেকে বাকি সব আচার অনুষ্ঠান চলতো। যুগের সাথে সাথে মেলার আকার আয়তন কমে আসলেও আজ থেকে তিন চার দশক আগে পর্যন্ত পুকুরের জল বেশ স্বচ্ছ এবং এলাকাবাসীর সব নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহার হতো। যখনও পর্যন্ত আমাদের জীবন তার বিষ বাতাসে ঘিরে ফেলেনি প্লাস্টিক দস্যু।

তারপর ক্রমে পুকুরের মূল মালিকের থেকে দু বার হাতবদল হতে হতে আজ এই ঐতিহাসিক ঐতিহ্যবাহী পুকুর পরিণত হয়েছে পানায় ঘেরা ডোবায়।এখন চড়কতলা মন্দির সেই এক জায়গায় থাকলেও আর এই পুকুরের চরম অপরিষ্কার দূষিত জল কোনো কাজে লাগে না পুজোর। পুরসভা দায়সারা ব্লিচিং পাউডার ছড়িয়ে, নির্দেশিকা বোর্ড টাঙিয়ে গেলেও লোকজনের তাতে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই।


বহু পুরোনো স্থানীয় মানুষের আক্ষেপ যে এখনও আছে তাদের এই পুণ্য জলাশয়ে’র মৃতপ্রায় অবস্থায়। আমরা সার্ভে করতে গিয়ে একজনকে প্রশ্ন করতে গেলেই চারপাশের বাড়ি থেকে পুকুরের মূল মালিকের বংশের প্রতিনিধি ষাটোর্ধ্ব প্রবীণ বেরিয়ে আসেন অতি উৎসাহী মুখে। তাঁর মুখেই শুনি তাদের থেকে বিক্রি হবার পর আবারও বিক্রি হবার পর সেই নতুন মালিকের হাতে এই জলাশয় বিক্রি করে নতুন নির্মাণ করার খবর শুনে চিন্তিত হয়ে তিনি যখন পুরসভা মারফত মেয়রে’র সাথে যোগাযোগ করে তাকে এলাকায় আসতে বলেন, তখন এলাকার প্রভাবশালী’দের মদতে কিভাবে পুরসভাকে আসতে দিতে বাধা দেয় সেই কাহিনী শোনা। হতাশ মুখে তিনি আমাদের দেখে বলেন, আপনারা সবাই চেষ্টা করে দেখুন না আমাদের এই স্মৃতিবিজড়িত পুকুরকে যদি এই উন্নয়নের হত্যা থেকে বাঁচানো যায়!

আমরা তাকে সেভাবে কোনো আশ্বাস দিতে না পারলেও, যদি আমরা এই শহরের সব সচেতন মানুষ একটু একটু করে এগিয়ে এসে নিজেদের এলাকার প্রাচীন ঐতিহ্য বাঁচিয়ে তুলে প্রকৃতি’র সহজাত স্বাভাবিক ভারসাম্য রক্ষা করতে পারি, তবেই হয়তো আগামীদিনে জলাশয়ের সাথে সাথে তলিয়ে যাবার হাত থেকে রক্ষা পাবে আমার আপনার আমাদের সবার ভালোবাসার শহর।

প্রশ্ন রইলো। একটু ভেবে দেখার।

Published by JaladarshaCollective

Jaladarsha the Sanskrit expression meaning "watery mirror" denotes the reflective work of the collective which aims to highlight and bring back into discourse the important aspects of nature and culture in cities and villages of West Bengal. The collective comprises of theatre practitioners, writers, artists, singers, researchers, community process workers and trans artists. Find regular updates on Social Media platforms: 1. Facebook: facebook.com/jaladarsha 2. Instagram: @jaladarshacollective

Leave a comment

Design a site like this with WordPress.com
Get started