লোকায়ত বীজের পুনরুজ্জীবনই প্রাকৃতিক চাষের মূল চাবিকাঠি

সৌমিক ব্যানার্জি

(তরজমা পীযূষ দত্ত)

প্রকৃতির সহনশীলতার গূঢ় রহস্য হলো বৈচিত্র্য। সমুদ্রের গহ্বর থেকে সর্বোচ্চ পর্বতচূড়া পর্যন্ত, সর্বত্র ছড়িয়ে রয়েছে অগণিত প্রাণীর অপরূপ বৈভব। মানবসভ্যতার শুরু থেকেই এই বৈচিত্র্য আমাদের বেঁচে থাকতে সাহায্য করেছে। হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ ও আরো বিভিন্ন গোষ্ঠীগুলি প্রায় ২০,০০০ প্রজাতির উদ্ভিদকে খাদ্য হিসাবে ব্যবহার করে চলেছে। আজও সারা বিশ্বে প্রায় ৪,০০০ প্রজাতির বনজ উদ্ভিদ খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ভারতের বন সংলগ্ন গ্রামগুলিতে প্রায় ২০০ থেকে ৭০০ ধরনের বনজ খাদ্য সংগ্রহ করে খাওয়া হয়। এই বনজ বৈচিত্র্য ছাড়াও মানুষ হাজার হাজার বছর ধরে প্রকৃতির সাথে সহাবস্থান করে চলেছে , এবং তারা প্রকৃতির অসংখ্য উদ্ভিদ ও প্রাণীকে পালন করে চলেছে, যা বছরের পর বছর ধরে মানুষের প্রধান খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

আনুমানিক ছয় হাজার প্রজাতির চাষকৃত উদ্ভিদ রয়েছে, যার মধ্যে মাত্র ২০০টি (৩%) বর্তমানে বৈশ্বিক খাদ্য সরবরাহে রয়েছে এবং মাত্র ৯টি (০.১৫%) ওজনের দিক থেকে ৬৬% অবদান রাখে। এগুলো হলো: ধান, গম, সয়াবিন, ভুট্টা, কাসাভা, আখ, সুগার বিট, আলু ও অয়েল পাম। আমরা এই যে বৈচিত্র্যের ক্ষেত্রে এক ব্যাপক ভারসাম্যহীনতা লক্ষ্য করছি, তা কেবল রাসায়নিক কৃষি ও বন ধ্বংসের মাধ্যমে পরিবেশের উপরই ভয়াবহ প্রভাব ফেলেনি, বরং পুষ্টির ঘাটতি ও আধুনিক জীবনযাত্রাজনিত রোগের মাধ্যমে আমাদের অর্থনীতি, খাদ্যাভ্যাস, স্বাস্থ্য ও সমাজকেও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

স্থানীয় ফসলের দেশীয় প্রজাতির বীজ হলো পরিবেশবান্ধব কৃষির প্রথম ধাপ। কৃষির সূচনালগ্ন থেকে কৃষকরা  চাষ, প্রজনন, সংরক্ষণ, বিনিময় ও রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে ফসল ও তাদের বৈচিত্র্যের এক বিশাল ভাণ্ডার গড়ে তুলেছে।

এই লোকায়ত বীজগুলো তাদের স্থানীয় পরিবেশে বিবর্তিত হয়ে জলবায়ু, মাটি, কৃষি পদ্ধতি ও জৈবিক ও অজৈব চাপ সহ্য করার ক্ষমতার সাথে অভিযোজিত। এগুলো পুষ্টিগুণেও সমৃদ্ধ, স্থানীয় মাটি ও জৈব সারের সাথে সবচেয়ে ভালোভাবে খাপ খায় এবং স্থানীয় বাজারে এগুলোর চাহিদা রয়েছে। লোকায়ত বীজ হাজার বছরের অবিচ্ছিন্ন ইতিহাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, খাদ্য নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক।

বীজ বিচ্ছিন্ন সত্তা নয়, এদের নিজস্ব বায়োম রয়েছে। এই সহাবস্থানকারী অণুজীব বা এন্ডোফাইটস, বীজের সর্বত্র থাকে এবং গাছের স্বাস্থ্য ও পুষ্টির নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। এরা নাইট্রোজেন স্থিরকরণ, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উৎপাদনের মাধ্যমে গাছকে অজৈব চাপ থেকে রক্ষা করে এবং গাছের বৃদ্ধি হরমোন নিঃসরণ করে।

লোকায়ত জাত আধুনিক জাতের চেয়ে শ্রেষ্ঠ, কারণ এগুলো –  

– স্থানীয়ভাবে উন্নত ও স্থানীয় অবস্থার সাথে অভিযোজিত  

– উচ্চ বাস্তুতান্ত্রিক বৈচিত্র্যপূর্ণ অঞ্চলের জন্য উপযোগী  

– বিস্তৃত জিনগত ভিত্তি রয়েছে  

– জাতের মধ্যে পরিবর্তনশীল জিনের কম্পাঙ্ক  

– মুক্ত পরাগায়ন ঘটে ও আন্তঃপরাগায়নকে উৎসাহিত করে  

– বনজ প্রজাতির সাথে জিনের প্রবাহ সম্ভব করে  

– স্থানীয় অণুজীব সহাবস্থানকারীদের সাথে শক্তিশালী সম্পর্ক গড়ে  

– মিশ্র ফসলচাষ পদ্ধতির সাথে ফেনোটাইপিক অভিযোজন ঘটে  

– উচ্চতর পুষ্টি আহরণ ক্ষমতা সম্পন্ন  

কৃষকরাই ছিলেন প্রথম বীজ প্রজননকারী, এবং সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ ও বহু প্রজন্মের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে তারা ইতিহাসে অতুলনীয় জাতের এক বিস্ময়কর ভাণ্ডার সৃষ্টি করেছেন। আজও আদিবাসী ও আরো বহু গোষ্ঠীর কৃষকরা নতুন জাত উদ্ভাবন করছেন, তার সাথে সম্প্রদায়ের মধ্যে এই বীজ চাষ, পুনর্ব্যবহার ও বিনিময় করছেন।  

লোকায়ত জাত পরিবেশবান্ধব কৃষির জন্য আদর্শ, এবং জলবায়ুজনিত আঘাত থেকে সহনশীলতা প্রদানের পাশাপাশি উচ্চ পুষ্টিগুণ নিশ্চিত করে। এটি বিকেন্দ্রীভূত বীজব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে, সম্প্রদায়গুলিকে স্বনির্ভর করে তোলে।

“সবুজ বিপ্লব”-এর সূচনালগ্ন থেকে, ধান ও গমকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে, এবং ফসলের গঠনকে কৃত্রিম সারের প্রতি সংবেদনশীল করে ফলন বাড়ানোর লক্ষ্যে প্রজনন কর্মসূচি নেওয়া হয়। তখন থেকে জোয়ার-বাজরা, ডাল ও তৈলবীজ ফসলের পাশাপাশি জাতীয় বৈচিত্র্য ব্যাপকভাবে হ্রাস পেতে থাকে। সারের প্রতি সংবেদনশীল জাপোনিকা ধান ও মেক্সিকান গম, এবং পরবর্তীতে সয়াবিন, জিএম তুলা, সংকর ভুট্টা ও সবজির প্রচার রাসায়নিকের ব্যবহার, ভূগর্ভস্থ জল উত্তোলন ও কৃষি যান্ত্রিকীকরণকে ব্যাপকভাবে বাড়িয়েছে। এই পরিবর্তনগুলি বৈচিত্র্য ক্ষয় করছে, ভূদৃশ্য ও বাস্তুতন্ত্র রূপান্তরিত করছে এবং স্থানীয় মাটি, জল, প্রাণী, মানুষের খাদ্যাভ্যাস, স্বাস্থ্য, পুষ্টি নিরাপত্তা ও কৃষকের সার্বভৌমত্বকে প্রভাবিত করছে।

দেশী বীজ পরিবেশবান্ধব কৃষির দিকে প্রথম ধাপ, কারণ এই জাতগুলি স্থানীয় মাটি, বাস্তুতন্ত্র ও জলবায়ু ব্যবস্থায় প্রাকৃতিক উপাদানের অধীনে ভালো ফল দেয়। আদিবাসী এবং অন্যান্য সম্প্রদায়গুলির মধ্যে সহনশীলতা নিয়ে আসার ক্ষেত্রে এই কৃষি-জীববৈচিত্রকে ফিরিয়ে আনা দরকার। এটি কৃষকদের রাসায়নিক-নির্ভর ব্যবস্থা থেকে প্রাকৃতিক কৃষিতে সহজেই ফিরে আসতে সাহায্য করবে, পাশাপাশি ত্বরান্বিত জলবায়ু পরিবর্তন, অপুষ্টি ও জীবনধারাজনিত রোগের বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করবে।

কৃষির ভবিষ্যৎ এবং মাটি, উদ্ভিদ, প্রাণী ও মানুষের স্বাস্থ্য ও সুখ বজায় রাখার ধারাবাহিকতা নিহিত রয়েছে আমাদের হাজার বছরের পুরনো লোকায়ত ফসলের জাত ও ঐতিহ্যবাহী কৃষি বাস্তুতন্ত্রকে গ্রহণ করার মধ্যে।

Published by JaladarshaCollective

Jaladarsha the Sanskrit expression meaning "watery mirror" denotes the reflective work of the collective which aims to highlight and bring back into discourse the important aspects of nature and culture in cities and villages of West Bengal. The collective comprises of theatre practitioners, writers, artists, singers, researchers, community process workers and trans artists. Find regular updates on Social Media platforms: 1. Facebook: facebook.com/jaladarsha 2. Instagram: @jaladarshacollective

Leave a comment

Design a site like this with WordPress.com
Get started