রমেশ চন্দ্র মণ্ডল
চাষের মূল কথা হলো মাটি। জৈব চাষ পদ্ধতির প্রথম শর্ত মাটির স্বাস্থ্য ঠিক রাখা, মাটির প্রতি যত্নশীল হওয়া। মানুষকে সুস্থ থাকতে হলে তার শরীরে সঠিক পরিমানে – শর্করা, প্রোটিন, ভিটামিন, লিপিড, জল, খনিজ মৌল, খাদ্য তন্তু, উদ্ভিজ্জ রাসায়নিক – এসবের প্রয়োজন, এগুলির মধ্যে দিয়েই মানুষের দেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠে। তেমনি মাটির স্বাস্থ্য বা উর্বরতা শক্তি যদি ঠিক থাকে, তাহলে গাছে রোগ – পোকার আক্রমণ কম হবে। গাছ রোগ – পোকাকে প্রতিরোধ করে কাঙ্ক্ষিত ফলন দিতে পারবে।
এখন আলোচনা করব মাটির উর্বরতা বলতে কি বোঝায় তা নিয়ে। মাটিতে মিশে থাকে, নাইট্রোজেন, ফসফেট, পটাশিয়াম, জৈব কার্বন, অক্সিজেন। বিভিন্ন অনুখাদ্য যেমন ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, সালফার, ম্যাঙ্গানিজ, তামা, দস্তা, লৌহ, মলিবডেনাম, ক্লোরিন এবং অন্যান্য অণুজীব, জীব, জীবাণু। এগুলি যদি মাটিতে ঠিক থাকে এবং মাটির ফুসফুস যদি আলগা হয় তাহলে বুঝতে হবে মাটির স্বাস্থ্য বা উর্বরতা শক্তি ঠিক আছে।
মাটির উর্বরতা শাক্তি বোঝবার সহজ উপায়:
১) মাটি কোপাতে কষ্ট হবে না, মাটি ঝুরঝুরে হবে।
২) মাটিতে কেঁচোর বসবাস ভালরকম থাকবে।
৩) মাটির জলধারণ ক্ষমতা বাড়বে।
৪) আর সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, একজন কৃষক তাঁর মাটি দেখে এবং গাছের চেহারা দেখে বুঝতে পারে তার মাটির স্বাস্থ্য কেমন আছে।
এই জন্য কৃষককে বলা হয় প্রকৃত কৃষিবিজ্ঞানী। কোনো কৃষককে তো আর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় গিয়ে চাষ শিখতে হয়নি, সে মাটি ছুঁয়ে, মাটি ঘেঁটেই চাষ শিখেছে আর কৃষির নিজস্ব বৈজ্ঞানিক চিন্তাকে আয়ত্ত করেছে।
খারাপ মাটি, অর্থাৎ মাটির উর্বরতা শক্তি কম আছে, আমরা কী ভাবে বুঝবো? এটা জরুরি বিষয়।
১) মাটি খুব শক্ত থাকে, মাটি ভাঙতে চায় না।
২) মাটি ফ্যাকাশে চেহারা ধারণ করে। সাদাটে ধরণের।
যদিও এই লক্ষণগুলি এঁটেল ও দোয়াঁশ মাটির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। সব মাটির ক্ষেত্রে নয়।
৩) মাটি কোপালে ঝুরঝুরে হয় না।
আমরা কৃষকরা যুগ যুগ ধরে এই মাটিতে প্রতিনিয়ত ফসল উৎপাদন করে চলেছি। উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে হাইব্রিড বীজ, রাসায়নিক সার ও রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার করে মাটির উর্বরতা শক্তি শেষ করে ফেলছি। ভেবে দেখুন, মাটির থেকে আমরা কেবল নিই, দিই না তো কিছুই!
আমরা মাটির উপর ক্রমাগত বহু অযাচিত অত্যাচার করে চলেছি। পৃথিবীকে যদি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সুন্দর বাসভূমি করে রেখে যেতে চাই, তাহলে সময় এসেছে মাটিকে সরস করে গড়ে তোলার। ফিরে যাই আবার আগের কথায়, মাটির প্রতি আরও যত্নশীল হওয়ার সময় এসেছে।
মাটির উর্বরতা শক্তি ফিরিয়ে আনার জন্য কিছু পদ্ধতি আমাদের ব্যবহার করা উচিত –
১. যারা শহরাঞ্চলে বাড়ির ছাদে টবে চাষ করেন 1/2 মাটি, ভার্মি-কম্পোষ্ট, যদি গোবর সার পাওয়া যায়, হাড়ের গুঁড়ো, চুন – এক সঙ্গে মিশিয়ে হালকা খেলিয়ে দিতে হবে। ঐ সার মেশানো মাটিতে হালকা জল দিয়ে পলিথিন দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। এতে মাটির ভিতরে থাকা ক্ষতিকারক জীবাণু মারা যাবে। 15 দিন পর ঐ মাটি টবে ভরতে হবে। টবে যারা চাষ করেন, তাঁরা ঘরের ব্যবহার করা চা পাতা ভালো ভাবে ধুয়ে মাটিতে দিতে পারেন। বিভিন্ন সব্জির বাতিল অংশ, ফলের বাতিল অংশ একটি পাত্রে রেখে পচিয়ে মাটির সার হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। মাঝে মাঝে খোল জল ব্যবহার করতে হবে। যদিও খোল পাঁচ সাতদিন পচানোর প্রয়োজন।
২. গ্ৰামাঞ্চলে যারা কৃষির উপর নির্ভর করে জীবন – জীবিকা নির্বাহ করেন তাদের মাটির প্রতি মায়ের ন্যায় যত্নশীল হওয়া প্রয়োজন। মায়ের ন্যায় যত্নশীল, অর্থাৎ মা যেমন তাঁর সন্তানকে লালন পালন করে বড় করে তোলেন, মা যেমন সারাজীবন ধরে সন্তানকে শুধু দিয়ে যান। তেমনই সন্তানের উচিত মায়ের যখন শেষ বয়স, তখন মাকে দেখা, যত্ন নেওয়া। তেমনই মাটি জীব সৃষ্টির থেকে আজও পর্যন্ত, জীবের বাসস্থান ও প্রতিনিয়ত আহারের ব্যবস্থা করে চলেছে, বাঁচিয়ে রেখেছে মানুষ তথা জীব জগৎকে। তবে মনে রাখতে হবে সেই মাটিরও ক্ষয় আছে। সেই জায়গা থেকে মাটির প্রতি যত্নশীল হতে হবে। তার উর্বরতা শক্তি বজায় বা বৃদ্ধির জন্য আমাদের ব্যবস্থা নিতে হবে। তাহলে মাটি আমাদের ভবিষ্যতেও কাঙ্ক্ষিত ফলন দিয়ে যাবে।
প্রথমে মাটি ভালোভাবে চাষ করতে হবে। চাষ করে কয়েক দিন রৌদ্রে রাখা খুবই জরুরি। এতে একদিকে মাটি আলো বাতাস পেল। অন্যদিকে মাটির ভিতরে থাকা ক্ষতিকারক পোকার ডিম ও রোগের জীবাণু মারা গেল। এরপর মাটিতে গোবর সার, কম্পোষ্ট সার, যে কোন গুঁড়ো খোল, গাছের পাতা, ছাই, ধানের তুষ, কাঠের গুঁড়ো, চুন দিয়ে, দ্বিতীয় বার চাষ করতে হবে। এই ভাবে চাষ করলে মাটির স্বাস্থ্য ভালো থাকবে।
পুরানো পুকুরের পাঁক মাটি তুলে একটি বছর এক জায়গায় রেখে দিতে হবে তারপর ওই মাটি ব্যবহার করতে হবে। এই জাতীয় মাটির উর্বরতা শক্তি খুব ভালো হয়। কৃষকরা যুগ যুগ ধরে এই পদ্ধতি ব্যবহার করে আসছে। মাটিতে শুঁটি জাতীয় উদ্ভিদের চাষ একান্ত প্রয়োজন, যা মাটির উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধি করে। মাঝে মাঝে খোল পচানো জল ব্যবহার করতে হবে, বাড়ির আশেপাশে যাবতীয় পচনশীল গাছের পাতা জমিতে ব্যবহার করা যায়, ধানের খড় পচানো সার মাটির উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। তাতে মাটি জীবন্ত হবে। মাটির ফুসফুস আলগা হবে। জল ধারন ক্ষমতা বাড়বে। আমরা কাঙ্ক্ষিত ফলন পাবো। মাটি কখনো বন্ধ্যা হবে না। আগামী প্রজন্মের জন্য জীবন্ত মাটি রেখে যেতে পারবো। মাটি কথা বলবে।